মোটরগাড়ির পোড়া মবিলে চলা চুলা তৈরির পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি, অনলাইনে প্রচার আর যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ও আইনত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট।
আগামী ৯০ দিনের মধ্যে এসব চুলার উৎপাদন ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নির্মূলে আইনগত, প্রশাসনিক ও কারিগরি কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে- সেগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশও দিয়েছে আদালত।
সুলতানা শেহেরজাদ নামে একজনের করা রিট আবেদনের পর বুধবার (১ জুলাই) বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায়ের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দিয়েছে।
রিটকারীর আইনজীবী নুসরাত জাহান সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের মৌলিক অধিকার, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশ রক্ষার্থে এই রিটটি দায়ের করেছিলাম। ব্যবহৃত মোটর অয়েল পোড়ানোর ফলে যে মারাত্মক বিষাক্ত দূষক নির্গত হয়, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। আদালত শুনানি গ্রহণ করে পোড়া মবিল চুলার তৈরি, বাণিজ্যিক বিক্রি, অনলাইনে এর প্রচার এবং যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, সেই মর্মে রুল জারি করেছেন।
আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট নুসরাত জাহান। তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট নিলুফা সুলতানা, অ্যাডভোকেট মীর সাজিদ রুবেল ও অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে বিবাদীদের প্রতিনিধিত্ব করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। তাকে সহায়তা করেন দুই ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিলা আহমেদ ও জাশেদুল জনি।
রিট আবেদনে পরিবেশ, আইন, স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ মোট ১১ জনকে বিবাদী করা হয়।
আবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবহৃত মোটর অয়েলকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা উন্মুক্ত বাতাসে পোড়ানো বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
রিট আবেদনের যুক্তিতে বলা হয়, প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা এই চুলার পাশে কাজ করায় রেস্তোরাঁর বাবুর্চি ও ভাসমান বিক্রেতারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। বিষাক্ত ধোঁয়া ক্রমাগত শ্বাসগ্রহণের ফলে তাদের শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ও ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। চুলার অসম্পূর্ণ দহনের ফলে নির্গত কার্সিনোজেনিক ভারী ধাতব মিশ্রিত বিষাক্ত কণা সরাসরি রাস্তার খোলা খাবার ও রান্নার তেলে মিশে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলকে দূষিত করছে।
এছাড়া দাহ্য এই তরল বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে ঘিঞ্জি এলাকা ও জনাকীর্ণ বাজারে ব্যবহারের ফলে যে কোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে, যা জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
এর পাশাপাশি যেখানে সেখানে এই বর্জ্য তেল নিষ্কাশনের ফলে মাটি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা হয়ে জলাশয়ের ইকোসিস্টেম ধ্বংস হচ্ছে। দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় এটি সুস্পষ্ট ‘পাবলিক নুইসেন্স’ হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অবাধে এই চুলার প্রসার ঘটানো হচ্ছে বলে রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়।
আবেদনে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বেশ কয়েকটি নির্দেশনা চাওয়া হয়। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জনসমাগমস্থল, খোলা খাবারের দোকান ও কারখানা থেকে এসব চুলা বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংস করার আরজি জানানো হয়।
সেইসঙ্গে ইউটিউব ও ফেসবুকের মত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব চুলার প্রস্তুত প্রণালি সংক্রান্ত ভিডিও এবং বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে বিটিআরসিকে তাৎক্ষণিক কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার প্রার্থনা করা হয়।
একইসঙ্গে ব্যবহৃত মোটর অয়েল পোড়ানোর ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি, অগ্নিকাণ্ডের শঙ্কা ও পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে দেশব্যাপী সংবাদমাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানোর নির্দেশনাও চাওয়া হয় ওই রিট আবেদনে।


